ক্যাপচা কী? এটি কীভাবে কাজ করে এবং প্রয়োজনীয়তা

ক্যাপচা কী

আমরা যারা দিনের অনেকটা সময় বিভিন্ন কাজে ইন্টারনেট ব্রাউজ করে থাকি, তখন আমাদেরকে প্রায়ই “আমি রোবট নাকি মানুষ?” অর্থাৎ ক্যাপচা (CHAPTCHA) পূরণ করে এর প্রমাণ দিতে হয়। কিন্তু আমরা অনেকেই জানি না, কী এই ক্যাপচা? কেন এটি পূরণ করতে হয়? এটির কাজ কী? এর প্রয়োজনীয় কী? জানতে হলে পড়ে ফেলুন পুরো আর্টিকেলটি।

 

সারাদিন বিভিন্ন কাজে আমাদেরকে এই ওয়েবসাইট থেকে ওই ওয়েবসাইটে বিচরণ করতে হয়, আর এই বিচরণ করতে গিয়ে প্রায়ই এই ক্যাপচা নামক বিরক্তিকর জিনিসটার সম্মুখীন হতে হয়। কিন্তু আসলেই কি এতে আমাদের বিরক্ত হওয়া উচিত? এটি তো আমাদের নিরাপত্তার জন্যই দেওয়া হয়। আসলে আমরা বিরক্ত হবার কারণ হলো, এটি সম্পর্কে আমরা বিস্তারিত জানি না। তাই আমাদের এ সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেওয়া উচিত।

 

ক্যাপচা (CAPTCHA) কী?

 

প্রথমত ক্যাপচা (CAPTCHA) কোনো মৌলিক শব্দ নয়। এটি কয়েকটি শব্দের সংক্ষিপ্ত রূপ। এর পূর্ণরূপ হলো- Completely Automated Public Turing test to tell Computers and Humans Apart. সাধারণ ভাবে বলতে গেলে, এটি এমন একটি পদ্ধতি যা মানুষ ও রোবটের মধ্যে পার্থক্য গড়ে দিতে সক্ষম হয়। অতএব কম্পিউটার বা স্মার্ট ফোন স্কিনের সামনে যিনি এটি পরিচালনা করছেন তিনি আসলেই একজন মানুষ নাকি কোনো রোবট, এটি নির্ধারণ করাই এই ক্যাপচার মূল কাজ। আর এটা নির্ধারণ করার পেছনেও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

 

ক্যাপচা এর ইতিহাস

 

ক্যাপচা মূলত আবিষ্কৃত হয় ১৯৯৭ সালে। এটি আবিষ্কারের মূল কারণ ছিল, তখনকার সময়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় সার্চ ইঞ্জিন ছিল আল্টাভিস্তা (Altavista) নামক একটি ব্রাউজার। কিন্তু তখনকার সময়ের অনেক প্রোগ্রামার রোবটিক প্রোগ্রাম তৈরি করে অটোমেটিকভাবে প্রচুর পরিমাণে স্প্যামিং করতো। এই স্প্যামিং ঠেকাতেই আল্টাভিস্তা (Altavista) এই ক্যাপচার আবিষ্কার করে। যদিও এটির নাম তখন ক্যাপচা ছিল না। পরবর্তীতে ২০০৩ সালে কার্নেগি মেলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিকোলাস হপার, ম্যানুয়েল ব্লুম, লুইস ভন আহন ও জন ল্যাংফোর্ড এর নামকরণ করেন ক্যাপচা (CAPTCHA)।

 

গুগলের এক তথ্যমতে প্রতিদিন সারা পৃথিবীতে ২০০ মিলিয়ন বার ক্যাপচা পূরণ করা হয়। অতএব প্রতিটি ক্যাপচা পূরণ করতে যদি ১০ সেকেন্ড করেও সময় লাগে তাহলে প্রতিদিন সারাবিশ্বের মানুষের সময় ব্যয় হয় প্রায় ৪ হাজার বছর।

 

ক্যাপচার প্রকারভেদ

 

আমরা সাধারণত অনেক ধরনের ক্যাপচাই দেখতে পাই৷ নিচে কিছু ক্যাপচার নাম দেওয়া হলো –

1. Re-captcha
2. Math Solving Captcha
3. Picture Identification Captcha (Re-CAPTCHA)
4. 3D Captcha
5. Ad-injected Captcha
6. jQuery Drop Captcha
7. Drag and Drop Captcha
8. Tic Tac Toe Captcha

 

তবে বর্তমানে আমাদেরকে সবচেয়ে বেশি ‘Picture Indentification’ ক্যাপচাটির সম্মুখীন হতে হয়।

 

ক্যাপচা কীভাবে কাজ করে?

 

ক্যাপচা এর আবিষ্কারই হয়েছিল বুট বা রোবটিক কোনো প্রোগ্রাম দ্বারা করা স্প্যামিংগুলো ঠেকাতে। এবং এর মূল কাজ হচ্ছে যেই ডিভাইস থেকে সাইটের এক্সেস করা হচ্ছে সেই ডিভাইসটি কোনো মানুষ পরিচালনা করছে নাকি প্রোগ্রামারের তৈরি কোনো বট দ্বারা অটোমেটিকভাবে এক্সেস করা হচ্ছে। আর এটা বুঝতে পারলেই স্প্যামিং আটকানো সম্ভব হবে।

মানুষ নাকি বুট, এটা বোঝার জন্যই ক্যাপচাগুলোতে পরিচালনাকারীর জন্য এমন কিছু কাজ দেওয়া হয় যা একজন মানুষের জন্য খুবই সহজ কিন্তু একটি রোবট বা অটোমেটিক বটরের জন্য অনেক কঠিন।

 

যেমন কোনো কোনো ক্যাপচাতে ব্যবহারকারীকে কিছু ইংরেজি ছোট ও বড় হাতের অক্ষর ও নম্বর একত্রে বিকৃতভাবে দেওয়া থাকে। যদিও সেটা যে কোনো মানুষের মস্তিষ্ক সহজেই ধরতে পারবে। বা কোনো কোনো কোনো ক্যাপচাতে ২/৩টি সংখ্যা দিয়ে যোগ করতে বলা হয়৷ এটিও এতটাই সহজ যে;

 

যেকোনো মানুষ তা পূরণ করতে পারবে। কিন্তু কম্পিউটার প্রোগ্রাম বা বটের পক্ষে এটি একা একা করতে অনেক কষ্ট হয়ে যাবে৷ কারণ কম্পিউটার মূলত কোডিং ছাড়া অন্য কোনো ভাষা বুঝে না৷ অতএব কম্পিউটার প্রোগ্রাম যেহেতু সাধারণ অক্ষর বা অংকের ভাষা বুঝে না তাই এর পক্ষে ক্যাপচা পূরণ করে সাইটে এক্সেস করা সম্ভব হয় না। ফলে স্প্যামিংয়ের সম্ভাবনাও অনেকাংশে কমে আসে।

 

কিন্তু প্রতি বছরই প্রযুক্তির উন্নতির ফলে এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সির বদৌলতে পূর্বের ওই ক্যাপচার কার্যকারিতা অনেকটা দূর্বল হয়ে পড়ে। পরে এ সমস্যা সমাধানে গুগল আরেকটি নতুন ক্যাপচা আবিষ্কার করলো। যা পূর্বের ক্যাপচাগুলো থেকে অধিক ইন্টেলিজেন্স ও স্মার্ট। একই সাথে এটি মানুষের জন্য হয়ে গেল আরো সহজ এবং অটোমেটেড স্ক্রিপ, প্রোগ্রাম বা বটের জন্য হয়ে গেল আরো কঠিন৷ এই ক্যাপচাটির নাম হলো রি-ক্যাপচা (Re-CAPTCHA).

 

এই ক্যাপচাতে টেক্স বা নম্বর ব্যবহারের পরিবর্তে স্কিনে ছোট ছোট ছবি ভেসে আসে। এই ছবিগুলো থেকে নির্দেশনা অনুযায়ী নির্দিষ্ট কোনো একটি অবজেক্ট সিলেক্ট করতে হয়।

 

ধরুন এমন একটি ছবি দেওয়া থাকলো, যেখানে একটি রাস্তা দিয়ে কয়েকটি বাস যাতায়াত করছে এমন কিছু৷ এখন ক্যাপচাতে নির্দেশনা দেওয়া ছিল “Select all squares with Bus” অর্থাৎ উক্ত ছবির মধ্যে যে স্কয়ার গুলোর মধ্যে বাসগুলো আছে সে স্কয়ারগুলো সিলেক্ট করলেই ক্যাপচা পূরণ হয়ে যাবে এবং সাইটে এক্সেস করতে পারবেন কিন্তু আপনি যদি সঠিকভাবে সিলেক্ট করতে না পারেন তাহলে কোনোভাবেই সাইটে এক্সেস করতে পারবেন না। এটি একজন মানুষের জন্য অত্যান্ত সহজ হলেও কম্পিউটার প্রোগ্রাম বা বটের দ্বারা প্রায় অসম্ভব।

 

বর্তমানে সবচেয় জনপ্রিয় ও সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ক্যাপচা এটি। এমনকি আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্সের বদৌলতে অনেক সময় আপনাকে ক্যাপচা পূরণ করারও প্রয়োজন হবে না। ক্যাপচাতে ক্লিক করার সাথে সাথেই অটোমেটিকভাবে আপনাকে সাইটের এক্সেস দিয়ে দিবে৷ কিন্তু এটি কীভাবে কাজ করে?

 

এর পিছনের কারিগর হলো গুগলের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স। অর্থাৎ আপনি যখন সাইটে এক্সেস পাবার জন্য ক্যাপচার উপর ক্লিক করেন তখন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স আপনার মাউসের কার্সর এর মুভমেন্ট ট্র্যাক করে। কারণ যখন একজন মানুষ মাউসের কার্সর মুভ করে তখন সেটা নির্দিষ্ট সরলরেখায় মুভ হয় না। বিভিন্নভাবে বিভিন্ন দিকে মুভ করতে থাকে।

 

কিন্তু কোনো রোবট যদি এই কাজটি করে থাকে, তার মাউসের কার্সর মুভমেন্ট হবে সরলরৈখিকভাবে। আর এর দ্বারাই প্রমাণ হয়ে যাবে আপনি মানুষ নাকি রোবট৷ এছাড়াও আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স আপনার ব্রাউজারের কুকি, আপনার আইপি এড্রেস, ব্রাউজিং স্টোরি চেক করে থাকে৷ অতএব ওভারঅল বিবেচনা করার পর আপনি মানুষ কিনা তা প্রমাণ হলে কোনো ধরনের টাস্ক ছাড়াই আপনাকে সাইটে এক্সেস দেওয়া হয়। নতুবা সবকিছু পর্যবেক্ষন করার পরও কোনো সন্দেহ থাকলে তবেই আপনাকে ওই ক্যাপচা পূরণ করে নিজের অস্তিত্বের প্রমাণ দিতে হয়।

ক্যাপচা ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা কী?

 

মূলত স্প্যামিং আটকানোর জন্য ক্যাপচা আবিষ্কার করা হলেও বর্তমানে এটি বিভিন্ন প্রয়োজনে ব্যবহার করা হয়ে থাকে৷ ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তার স্বার্থেই এটি ব্যবহার করা অতিব জরুরি। একটি উদাহরণ দিই তাহলে –

 

মনে করুন আগামীকাল মিরপুর শেরে-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ভারত বনাম বাংলাদেশের ম্যাচ৷ স্বাভাবিকভাবেই অনেক উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচ হবার কারণে দর্শক সংখ্যাও অনেক বেশি হবে। তাই টিকিটের চাহিদাও প্রচুর। এখন যদি কোনো প্রোগ্রামার এই সুযোগে কোনো আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সি প্রোগ্রামকে কাজে লাগিয়ে ম্যাচের আগের দিনই অনলাইনের সব টিকিট কিনে ফেলে, তখন? তখনতো টিকিট আউট অফ স্টক হয়ে যাবে। এবং টিকিটের চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে শুরু করবে ব্ল্যাক মার্কেটিং। তখন সে টিকিটগুলো সাধারণ মূল্যের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি মূল্যে বিক্রি করা শুরু করে দিবে!

কিন্তু এই ক্যাপচার জন্য সে কখনো এটি করতে পারবে না৷ কারণ একজন ব্যক্তি কখনো কোনো অটোমেটেড রোবট বা বট ছাড়া একা একা এতোগুলো টিকিট ক্রয় করতে পারবে না। একসাথে অনেক গুলো টিকিট ক্রয় করতে হলে তাকে অটোমেটেড রোবট বা বটের সাহায্য নিতে হবে। আর যখনই এই অটোমেটেড রোবট বা বট ক্যাপচার পাল্লায় পড়বে তখনই সে আর টিকিট কেনার জন্য সাইটে এক্সেস করতে পারবে না। অতএব কোনো স্প্যামারও সবগুলো টিকিট ক্রয় করে ব্ল্যাক মার্কেটিং করার সুযোগ পাবে না।

এছাড়াও স্প্যাম মেইল, অনলাইন পুলস, কোথাও লগ ইন করার জন্য একই সাথে অনেকগুলো আলাদা পাসওয়ার্ড ব্যবহার, ওয়েবসাইটে কমেন্ট স্প্যামিং সহ আরো বিভিন্ন সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে এই ক্যাপচা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

Share With

Share on facebook
Share on twitter
Share on email

You may also like

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *